সর্ব প্রথমেই বলে নিতে চাই “সাইবার সিকিউরিটি” এর সম্পূর্ণ ধারনা এই পোষ্ট থেকে পাবেন না কিংবা আমি সব কিছুর উপরে ধারনাও রাখি না। তবে আমার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতার আলোকে একজন ফ্রিল্যান্সার কি কি বিষয়ে সতর্ক থাকলে, তার প্রয়োজনীয় একাউন্ট এবং উপার্জিত ডলার নিরাপদ রাখতে পারবে তা নিয়ে বেশ ভালো ধারনা পাওয়া যাবে। সরাসরি মূল লেখায় চলে যাচ্ছি।

১) ইন্টারনেট সিকিউরিটিঃ সর্ব প্রথমেই একটা ভালো মানের এন্টিভাইরাস এবং ইন্টারনেট সিকিউরিটির কথা বলবো। উইন্ডোস ডিফেন্ডার কিংবা কোনো ভালো এন্টিভাইরাসের  ফ্রি ট্রায়াল ভার্সন নিয়ে পড়ে থাকবেন না। বাজারে পেইড যেসব এন্টিভাইরাস পাওয়া যায়, সেগুলো থেকে রেপুটেশন দেখে ভালো একটা কিনে নিন। আমি রিকমেন্ড করবো “eSet Internet Security” এছাড়াও Bitdefender, Kaspersky, McAfee, Norton ইত্যাদি এন্টিভাইসগুলোও খুব ভালো।   এবার ধরে নিলাম আপনি এন্টিভাইরাস ব্যবহার করছেন। তার মানে আপনি সুরক্ষিত এবং নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন, তাইনা? যদি এটা ভেবে থাকেন ভুল করছেন। অনেক অনেক বিষয় আছে তার মধ্যে চেষ্টা করবো আমরা যেসব ভুল সচারাচর করে থাকি কিংবা যেসব জিনিস গুরুত্ব না দিলে আমাদের ঝামেলায় পড়তে হতে পারে সেগুলো তুলে ধরার।

 ২) ব্রাউজার কুকিঃ আমরা প্রতিদিন যেসব সাইটে ভিজিট করি আমাদের ব্রাউজার কিন্তু সেসব সাইটের কুকি সেভ করে রাখে। যদিও এটা করে আমাদের দ্রুত ব্রাউজিং এক্সপিরিয়েন্স এর জন্য কিন্তু এর থেকে বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনার উচিত মাঝে মাঝে ব্রাউজার কুকি ডিলেট করা। (বিঃদ্রঃ ব্রাউজার ‍কুকি হ্যাক হয়ে ২০১৭ সালে আমার পেওনিয়ার থেকে ২৫০ ডলার চুরি হয়। পরবর্তীতে পেওনিয়ারের সহায়তায় এবং তাদের ইনভেষ্টিগেশনের মাধ্যমে জানতে পারি এন্টিভাইরাস ব্যবহার করার পরেও আমার ব্রাউসারের কুকি হ্যাক হয়ে এমন দুর্ঘটনা ঘটে। আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় এবং সকলের দোয়ায় দীর্ঘ ৩০ দিন পরে আমি আমার পেওনিয়ার একাউন্ট ফেরৎ পাই এবং ৩ মাস পরে পেওনিয়ার আমাকে আমার চুরি হওয়া ডলার উদ্ধার করে ফেরৎ দেয়।

৩) ব্রাউজারে পাসওয়ার্ড সেভ করাঃ আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা ব্রাউজারে অনায়াসে পাসওয়ার্ড সেভ দিয়ে রাখেন। এটা বেশ ভালো একটা সুবিধা কিন্তু যখন বিপদ হবে তখন এর অসুবিধা টের পাবেন। কিন্তু উপায় কি? এত এত সাইটের ইউসারনেম পাসওয়ার্ড তো মনে রাখা সম্ভব না কিংবা বার বার টাইপ করা বিরক্তকর। এক্ষেত্রে, বিশ্বস্ত কোনো পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করুন। যেমনঃ Dashlane, LastPass, Keeper Password Manager ইত্যাদি। আমি নিজে LastPass ব্যবহার করি। আপনাকে একটা মাষ্টার পাসওয়ার্ড দিয়ে এসব পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করতে হবে এবং বাকি সকল পাসওয়ার্ড এই পাসওয়ার্ড ম্যানেজারে সেভ রাখতে পারবেন। যখনি কোনো সাইট ভিজিট করবেন যেটার পাসওয়ার্ড আপনি সেভ করেছেন, সেই পাসওয়ার্ড আর দ্বিতীয় বার আপনাকে টাইপ করতে হবে না। ফিল করে দিয়ে সহজেই লগিন করতে পারবেন। LastPass এর এডঅন ক্রোম এবং মজিলার জন্য এভেইলএবল এবং মোবাইলের জন্যও প্লে-ষ্টোরে এ্যাপ রয়েছে। আরও বিস্তারিত ব্যবহার জানতে চাইলে, যেই পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করতে চাচ্ছেন, সেটার ভিডিও ইউটিউব থেকে দেখে নিবেন।

৪) সেফ ব্রাউজিং অথবা ভিন্ন ব্রাউজার ব্যবহারঃ আমরা ফ্রিল্যান্সাররা যেহেতু আমাদের ইনকামের টাকা প্রথমত ডলার হিসাবে কোনো অনলাইন একাউন্টে আনি যেমন “পেওনিয়ার” এক্ষেত্রে আমাদের উচিত অন্তত পেওনিয়ার ব্যবহারের সময় সেফ ব্রাউজিং করা, যেটা ব্রাউজারে “Incognito Mode Browsing” নামে পরিচিত। অথবা আমরা সকল কাজের জন্য একটা ব্রাউজার এবং পেমেন্ট সংক্রান্ত সাইটগুলো আলাদা একটা ব্রাউজারে ব্যবহার করে, ব্যবহার শেষে সাথে সাথে সকল ব্রাউজিং ডাটা এবং কুকি ক্লিয়ার করে ফেলতে পারি। যেহেতু এসব সাইট আমরা সব সময় ব্যবহার করি না, তাই এইটুকু ঝামেলা করে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা সহজেই করতেই পারি।

৫) ২ ষ্টেপ ভেরিফিকেশন চালু রাখাঃ নির্দিষ্ট কিছু একাউন্টে যদি ২ ষ্টেপ ভেরিফিকেশন এর সুযোগ থাকে তাহলে এটা চালু করুন, যাতে পাসওয়ার্ড চুরি হলেও আপনার মোবাইলে আসা কোড ছাড়া লগিন করা সম্ভব না হয়। বর্তমানে যদি জিমেইল একাউন্ট ব্যবহার করেন তাহলে জিমেইল এবং পেওনিয়ারের জন্য এটি চালু করতে পারেন।

৬) আলাদা ইমেইল ব্যবহারঃ পার্সোনাল সকল কাজ এবং যত ধরনের ওয়েবসাইট আপনি ব্যবহার করেন সব একটা ইমেইল দিয়ে কিংবা একাধিক ইমেইল দিয়ে ব্যবহার করুন। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য যেসব সাইট এবং একাউন্ট প্রয়োজন সেগুলোর জন্য একটা আলাদা ইমেইল রাখারা চেষ্টা করুন। যেমনঃ ফাইভার, পেওনিয়ার, আপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার ডট কম ইত্যাদি সাইটের জন্য আলাদা একটি ইমেইল ব্যবহার করুন এবং সম্ভব হলে জিমেইল ব্যবহার করে সেই মেইলে ২ ষ্টেপ ভেরিফিকেশন চালু রাখুন।

৭) সিকিউরিটি কোয়েশ্চেনঃ আমরা ফাভাইভার কিংবা পেওনিয়ারে একাউন্ট খুলতে গেলে সিকিউরিটি কোয়েশ্চেন এবং উত্তর দিতে হয়। এক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করুন এবং এমন প্রশ্ন ও উত্তর বাছাই করুন যেটা সহজে অনুমান করা যায় না। যেমন প্রশ্ন আছে আপনার মা কোথায় জন্মগ্রহণ করেছেন কিংবা আপনার স্কুলের নাম কি? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো আপনার পরিচিত কেউ সহজেই জানবে। তাই সিকিউরিটির স্বার্থে এমন প্রশ্ন এবং উত্তর দিন যেটা সহজে আন্দাজ করা যাবে না। মনে রাখবেন, এগুলো নিরাপদে এক জায়গায় লিখে রাখতে হবে কারন পরবর্তীতে আপনি নিজেই ভুলে গেলে অনেক ঝামেলায় পড়বেন।

৮) ভি.পি.এন ব্যবহারঃ যদিও এটা সবার জন্য বলবো না, তবে আপনি এ্যাডভান্স ইউসার হলে এবং সম্ভব হলে ভি.পি.এন ব্যবহার করুন। (বিঃদ্রঃ ভি.পি.এন দিয়ে অন্য সকল সাইট ব্যবহার করলেও ভুলেও ফাইভার ব্যবহার করবেন না। কেউ যদি এই পয়েন্টটা না বুঝে থাকেন, তাহলে সম্পূর্ণরুপে ইগনোর করবেন। কিন্তু নিষেধ করার পরেও কৌতুহলবশত কিংবা যে কোনো কারনে ভিপিএন দিয়ে ফাইভার ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্থ হলে আমি কিংবা ফাইভার বাংলাদেশ গ্রুপের কেউ দায়ী থাকবে না।)৯) পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহারঃ যেখানে সেখানে কোনো পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। প্রয়োজনে মোবাইল ডাটা দিয়ে জরুরী মেইল কিংবা অন্যান্য কাজগুলো করুন।

১০) টিম ভিউয়ার কিংবা রিমোট প্রোগ্রাম ব্যবহারে সতর্কতাঃ বিভিন্ন রিমোর্ট ডেস্কটপ সফটওয়্যার বিশেষ করে টিম ভিউয়ারের মতো প্রোগ্রাম ব্যবহারে সতর্ক হোন। ব্যবহারের প্রোয়জন পড়লে খুব শক্ত পাসওয়ার্ড যেমনঃ লেটার, নাম্বার সহ #@ এই সাইনগুলো ব্যবহার করুন। সেই সাথে নিশ্চিত করুন টিম ভিউয়ারে যেন ব্যকগ্রাইন্ড রানিং অপশনটি চালু না থাকে। 

সকলে সাবধান থাকবেন এবং নিজের কষ্টার্জিত টাকা নিরাপদে রাখবেন। সবার জন্য শুভ কামনা রইলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here